বৈশ্বিক রাজনীতিতে যখন যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে, তখন দিল্লিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ব্রিকস সম্মেলনের আবহে দুই রাষ্ট্রনেতার এই সাক্ষাৎ ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। বৈঠকে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতার প্রভাবও পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য রাশিয়ার মতো দীর্ঘদিনের জ্বালানি সহযোগীর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি নিয়ে আমেরিকার আপত্তি থাকলেও নয়াদিল্লি যে নিজের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা নয়, মোদী-পুতিন বৈঠক থেকেই সেই বার্তা মিলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। জ্বালানি ছাড়াও প্রযুক্তি, শিল্প এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও রয়েছে বড় প্রত্যাশা। ভারতীয় বায়ুসেনার সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানের আধুনিকীকরণ, সুখোই এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তি এবং আরও রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। এস-৪০০ ব্যবস্থায় ভারতের অভিজ্ঞতা নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধিকে আমেরিকার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান হিসেবে দেখছে না নয়াদিল্লি। ভারত বরাবরই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করে এসেছে। ফলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছে ভারত।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নেও ভারতের অবস্থান আলাদা। এর আগে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মোদী সংঘাতের অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে ভারতের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।
এদিকে ব্রিকস সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ভারত-রাশিয়া-চিনের মধ্যে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয় কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের। মোদী-পুতিন বৈঠক তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, পরিবর্তিত বিশ্ব কূটনীতিতেও নতুন বার্তা বহন করছে।

Leave a comment