টানা বৃষ্টি ও সম্ভাব্য বন্যার আশঙ্কায় বাংলার কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক নদী তীরবর্তী এলাকায় জল বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিভিসি থেকে জল ছাড়ার কারণে দামোদর তীরবর্তী হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা রয়েছে। মুণ্ডেশ্বরী ও রূপনারায়ণের তীরবর্তী এলাকাতেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও কার্শিয়াং নিয়েও সতর্কতা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য বড় ভরসা হতে পারে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা। চলতি খরিফ মরশুমে প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করার সময়সীমা বাড়িয়েছে কেন্দ্র। ফলে এখনও যাঁরা আবেদন করেননি, তাঁদের হাতে রয়েছে আরও কিছুটা সময়। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করা যাবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। সেই ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা চালু করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রকল্পের সূচনা হয়।

বন্যা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, কীটপতঙ্গ বা রোগের কারণে বিজ্ঞাপিত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে নির্দিষ্ট নিয়মে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হয়। প্রকল্পের নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে কৃষকরা বিমার মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান।

১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন

চলতি খরিফ মরশুমে অনেক কৃষক এখনও ফসল বিমার আওতায় আসতে পারেননি। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দেরি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিভিন্ন সমস্যার কারণে রেজিস্ট্রেশন কম হয়েছে বলে রাজ্যের কৃষি দফতরের তরফে কেন্দ্রকে জানানো হয়। এরপর রাজ্যের আবেদনের ভিত্তিতে সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষককল্যাণ মন্ত্রক। ফলে ঋণগ্রহীতা কৃষক এবং ঋণ নেননি এমন কৃষক দুই ধরনের আবেদনকারীই ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন।

ধান, ভুট্টা-সহ বিজ্ঞাপিত ফসলের ক্ষেত্রে এই বিমার সুযোগ পাওয়া যাবে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় নাম নথিভুক্ত করার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া যায়। ক্রপ ইন্সুরেন্স অ্যাপের মাধ্যমে স্মার্টফোন থেকেই আবেদন করা সম্ভব। প্রথমে অ্যাপটি মোবাইলে ইনস্টল করে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে লগইন করতে হবে। এরপর ওটিপি দিয়ে মোবাইল নম্বর যাচাই করতে হবে। নাম, আধার নম্বর, বয়স, লিঙ্গ এবং অভিভাবকের নাম-সহ প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে।

জমির মালিক নিজে আবেদন করলে ফার্মার টাইপ হিসেবে ওনার নির্বাচন করতে হবে।এরপর ঠিকানা, জেলা, ব্লক ও গ্রামের তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি নমিনি এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণও দিতে হবে। আবেদনের সময় জমির তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পিএমএফ বাই ইন্সুরেন্স বিভাগে গিয়ে রাজ্য, মরশুম ও বছর নির্বাচন করার পর জমির জেলা, ব্লক, গ্রাম পঞ্চায়েত এবং মৌজার তথ্য দিতে হবে।

এরপর ফসলের ধরন, ফসলের নাম এবং রোপণের তারিখ উল্লেখ করতে হবে। খাতা নম্বর এবং প্লট বা দাগ নম্বরও দিতে হবে। একাধিক দাগ নম্বর থাকলে সেগুলি সঠিকভাবে লিখতে হবে। সমস্ত তথ্য দেওয়ার পর অ্যাপে জমির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য বিমার অঙ্ক দেখা যেতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে তথ্যগুলি ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

আবেদনের সময় ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পাতার পরিষ্কার ছবি আপলোড করতে হতে পারে। জমির পরচা এবং সোয়িং সার্টিফিকেট থাকলে সেগুলিও জমা দেওয়া যেতে পারে। তবে এই নথিগুলি ঐচ্ছিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর প্রসেট ফর পেমেন্ট ইউপিআই কিইউআর -এর মাধ্যমে ১ টাকা প্রিমিয়াম জমা দিতে হবে। পেমেন্ট সম্পন্ন হলে পিডিএফ রসিদ পাওয়া যাবে। সেই রসিদটি ডাউনলোড করে নিরাপদে রেখে দেওয়া উচিত।

ফসল বিমার আওতায় নাম নথিভুক্ত করলেই যে প্রত্যেক কৃষক নিশ্চিতভাবে টাকা পাবেন, তা নয়। বিজ্ঞাপিত ফসল, সংশ্লিষ্ট এলাকা, ক্ষতির ধরন এবং প্রকল্পের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বিমার দাবি বিবেচনা করা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হয়। সেই মূল্যায়ন এবং প্রকল্পের যোগ্যতার ভিত্তিতেই আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয়।

তাই বন্যা ও অতিবৃষ্টির আশঙ্কার মধ্যে থাকা কৃষকদের শেষ মুহূর্তে অপেক্ষা না করে দ্রুত আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে আবেদন সম্পূর্ণ করলেই চলতি খরিফ মরশুমে ফসল বিমার আওতায় আসার সুযোগ থাকবে।

Leave a comment