উত্তরবঙ্গে প্রথমবার জাতীয় সড়কের সঙ্গে হাতিদের যাতায়াতের জন্য তৈরি হতে চলেছে একাধিক আন্ডারপাস। হাতির করিডরগুলির কথা মাথায় রেখেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোট পাঁচটি আন্ডারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন করে তৈরি হতে চলা চার লেনের ৩২৭ নম্বর জাতীয় সড়কে এই আন্ডারপাসগুলি নির্মাণ হবে। জানা যাচ্ছে, বাগডোগরা থেকে নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি হয়ে গলগলিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩১ কিলোমিটার রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হবে এই বিশেষ পথ।
বাগডোগরা থেকে নকশালবাড়ি হয়ে পানিট্যাঙ্কি পর্যন্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই হাতির দল এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে যাতায়াত করে। রাস্তার যানবাহন বাড়লেও হাতিদের পুরনো যাতায়াতের পথ বদলায়নি। ফলে জাতীয় সড়ক পার হওয়ার সময় বারবার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ‘ঐরাবত’ সংস্থার তরফে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রকের কাছে আন্ডারপাসের দাবি জানানো হয়েছিল।
প্রস্তাবিত পাঁচটি আন্ডারপাসের মোট দৈর্ঘ্য হবে ১৭৬৫ মিটার। সন্ন্যাসী চা বাগান মোড় এলাকায় প্রথম আন্ডারপাসটির দৈর্ঘ্য ৩১৫ মিটার। দ্বিতীয়টি তৈরি হবে কিরণচন্দ্র চা বাগান এলাকায়। সেটিই সবচেয়ে বড়, দৈর্ঘ্য ৭০০ মিটার। একই চা বাগানের পাশেই তৃতীয় আন্ডারপাসটি হবে ৪৯০ মিটারের। অটল চা বাগান এলাকায় ৬০ মিটারের চতুর্থ এবং পানিট্যাঙ্কিতে ২০০ মিটারের পঞ্চম আন্ডারপাস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
হাতিদের জন্য তৈরি এই আন্ডারপাসগুলির উচ্চতা হবে সাত মিটার এবং চওড়া ২২ মিটার। কোথাও পিলার টাইপ, কোথাও ওয়াল টাইপ সাপোর্ট থাকবে। কিরণচন্দ্র চা বাগানকে হাতিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পথ দিয়ে একসঙ্গে ১০০-র বেশি হাতি পারাপার করে। তাই ৭০০ মিটারের আন্ডারপাসটির পাশে একটি ওয়াচ টাওয়ারও রাখা হবে।
শুধু আন্ডারপাস তৈরি করাই নয়, হাতিদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য একাধিক ব্যবস্থা থাকবে সেখানে। সাউন্ডপ্রুফ ব্যারিয়ার, ট্র্যাফিক সিগন্যাল পোস্ট, রবার স্ট্রিপ, ইকো-সেন্সিটিভ ফেন্সিং এবং সেন্সর-ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম থাকবে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমেও নজরদারি চালানো হবে।
চিকেনস নেকের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে সড়ক যোগাযোগ আরও মজবুত করার পাশাপাশি শিলিগুড়ি করিডরকে গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্র। প্রায় ২০৭৭.১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হবে চার লেনের এই রাস্তা। তবে রাস্তা তৈরির সময় যাতে হাতিদের স্বাভাবিক যাতায়াতে সমস্যা না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
বন দফতর সূত্রে খবর, সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত কার্শিয়াং ডিভিশনের বাগডোগরা, টুকরিয়াঝাড়, পানিঘাটা এবং বামনপোখরি রেঞ্জ এলাকায় প্রায় ২০০টি হাতি থাকে। খাবারের সন্ধানে বামনপোখরি রেঞ্জ হয়ে বাগডোগরা জঙ্গলে ঢোকে হাতির দল। পরে কিরণচন্দ্র-সহ বিভিন্ন করিডর ধরে উত্তম ছাঁট ও টুকরিয়াঝাড়ের জঙ্গলের দিকে যায়। এই যাত্রাপথে তাদের জাতীয় সড়ক পার হতে হয়।
হাতিদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে বাগডোগরায় ইতিমধ্যেই ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম রয়েছে। প্রায় ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং হেল্পলাইন নম্বরের মাধ্যমে নজরদারি চালান বনকর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে রয়েছে ১১টি কুইক রেসপন্স টিম, হাতি ট্রেকার এবং এলিফ্যান্ট স্কোয়াড।
এ প্রসঙ্গে হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর অনিমেশ বোস জানান, বাগডোগরার জঙ্গল পেরিয়ে হাতির দল নিয়মিত এশিয়ান হাইওয়ে পারাপার করে। তাঁর মতে, আন্ডারপাস তৈরির আগে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সঠিক জায়গাগুলি চিহ্নিত করা জরুরি। কার্শিয়াং ফরেস্ট ডিভিশনের ডিএফও দেবেশ পান্ডের বক্তব্য, হাতিদের যাতায়াতের পথে বাধা তৈরি হলে তারা অন্য রাস্তা ধরে জনবহুল এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে। জাতীয় সড়ক পার হওয়ার সময় ইতিমধ্যেই একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণেই আন্ডারপাসের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও জানান, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ সেই প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন।

Leave a comment