পুরভোটের দামামা বাজার আগেই কলকাতার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ। একসময় টিকিটের আশায় তৃণমূলের নেতা-নেত্রীদের বাড়িতে যাঁদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল, তাঁদের অনেকেই এবার ভোটে দাঁড়াতে চাইছেন না। কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছেন, কেউ আবার আর্থিক সমস্যার কথা বলছেন। এরই মধ্যে প্রাক্তন কাউন্সিলরদের একাংশ বিজেপির টিকিট পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন বলেও রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের পুরভোটে জয়ী তৃণমূলের ১৩৭ জন প্রাক্তন কাউন্সিলরের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৩৭ জনও মমতা শিবিরের হয়ে লড়ার আগ্রহ দেখাননি।
তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের বক্তব্য, এবার প্রার্থী হলে নিজেদের আর্থিক সামর্থ্যেই নির্বাচনের খরচ সামলাতে হবে। আগের মতো দলের ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। সেই কারণেই অনেকে ভোটের ময়দান থেকে সরে যাচ্ছেন বলে দাবি বিদায়ী কাউন্সিলরদের একাংশের।
‘মমতা তৃণমূল’-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য কয়েকজন প্রাক্তন কাউন্সিলর বিজেপির টিকিটের চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ বিজেপির হামলা এবং পুলিশি হেনস্তার আশঙ্কায় ভোটে দাঁড়াতে চাইছেন না। অন্যদিকে, বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রাক্তন কাউন্সিলরদের ঘনিষ্ঠদের বিজেপির সরকারি কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছে। কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিজেপির রাজ্য দফতরে পাঁচ হাজারেরও বেশি বায়োডাটা জমা পড়েছে বলে দলীয় সূত্রে খবর। সেগুলি খতিয়ে দেখার কাজ চলছে। শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার, তাপস রায়, সজল ঘোষ ও রীতেশ তিওয়ারির বাড়িতেও টিকিটপ্রত্যাশীদের ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসক, আইনজীবী-সহ বিভিন্ন পেশার পরিচিত মুখও পদ্মের টিকিট চাইছেন। বিজেপির দাবি, কলকাতার অন্তত ১৮০টি ওয়ার্ডে তারা জিতবে। সেই সঙ্গে পরবর্তী মেয়র কে হবেন, তা নিয়েও দলের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে, কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন দুই মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ও ফিরহাদ হাকিমের কেউই এখনও নির্বাচনে লড়ার কথা জানাননি। শোভন আপাতত সক্রিয় রাজনীতির বাইরে। ফিরহাদ জানিয়েছেন, তিনি বা তাঁর মেয়ে পুরভোটে প্রার্থী হবেন না। প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের ২২ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় তিনিও এখনও কোনও সিদ্ধান্ত জানাননি। তাঁর মেয়ে প্রিয়দর্শিনীও ভোটে দাঁড়াবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রাক্তন মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার এবং সন্দীপরঞ্জন বক্সীও এবার প্রার্থী হতে চাইছেন না। সন্দীপের ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় অন্য কোনও ওয়ার্ড থেকে লড়ার ইচ্ছা নেই তাঁর। অন্যদিকে, স্বপন সমাদ্দার জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। নতুন ও পুরনো ওয়ার্ড মিলিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ ৫২ জনের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। সেগুলির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভোটে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নেই।
বেহালার সঞ্চিতা মিত্র, ঘনশ্রী বাগ এবং রাসবিহারীর মনীষা বসু-সহ একাধিক প্রাক্তন কাউন্সিলরও আপাতত রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে রত্না শূর, রূপক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কয়েকজন প্রাক্তন কাউন্সিলর মমতা শিবিরের হয়ে লড়তে আগ্রহী। বেহালার প্রাক্তন বরো চেয়ারম্যান অঞ্জন দাসের বক্তব্য, হামলার আশঙ্কা থাকলেও তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী হয়েই ভোটে দাঁড়াতে চান। বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী চৈতালী দু’জনেই বিদায়ী বোর্ডের মেয়র পারিষদ ও বরো চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে এবার দু’জনেরই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন বৈশ্বানর। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দিলে তিনি প্রার্থী হতে পারেন।
অন্যদিকে, পুরভোটে আলাদা শক্তি হিসেবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস। দলের রাজ্য যুব সভাপতি সৌরভ বসু আগে ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। এবার ওই ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় হাজরা-রাসবিহারী এলাকায় লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। প্রাক্তন মেয়র পারিষদ সন্দীপন সাহা জানিয়েছেন, কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই প্রার্থী দেবে তাঁদের দল। সূত্রের খবর, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার কয়েকজন প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর এবার মমতা শিবিরের বদলে ডেমোক্রেটিক তৃণমূলের হয়ে খাম চিহ্নে লড়তে পারেন।
তবে কালীঘাটের তৃণমূল শিবিরের দাবি, খিদিরপুর, গার্ডেনরিচ, তপসিয়া, তিলজলা, এন্টালি, বালিগঞ্জ ও কসবার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিজেপির সঙ্গে তাদের সরাসরি লড়াই হবে। ভোটের দিন ওই এলাকাগুলিতে ১৯৯০ সালের পুরভোটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে পুরভোটের আগে কলকাতার রাজনৈতিক অঙ্ক ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য ও উত্তর কলকাতার একাধিক প্রাক্তন কাউন্সিলর এখনও ভোটে দাঁড়ানো নিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পরিবারের আপত্তির কথা জানিয়েই আপাতত এড়িয়ে যাচ্ছেন প্রশ্ন।

Leave a comment