হাসপাতালগুলিতে ক্রিটিক্যাল কেয়ার পরিষেবা আরও কার্যকর করতে একগুচ্ছ নির্দেশ জারি করল স্বাস্থ্য দফতর। হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যেসব CCU এবং ICU পুরোপুরি চালু হয়নি বা দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল হয়ে রয়েছে, সেগুলিকে দ্রুত পরিষেবায় ফেরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যভবনের নির্দেশ অনুযায়ী, চিহ্নিত ইউনিটগুলিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিষেবা চালু করতে হবে।
স্বাস্থ্য দফতরের ১১ দফা অ্যাডভাইজ়রিতে বলা হয়েছে, কোনও সরকারি হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের পরিকাঠামোগত কাজ শেষ হয়ে গেলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে সেটি হস্তান্তর করা হয়ে থাকলে তা আর বন্ধ রাখা যাবে না। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পরিষেবা চালু করা বাধ্যতামূলক। কোনও কারণে পরিষেবা শুরু করা সম্ভব না হলে সেই কারণ উল্লেখ করে স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে রিপোর্ট পাঠাতে হবে।
চিহ্নিত হাসপাতালগুলির মধ্যে রয়েছে বীরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতাল, ফ্রেজারগঞ্জ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চন্দননগর মহকুমা হাসপাতাল এবং গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতাল। এর পাশাপাশি সাগরদিঘি, বেলদা, ডেবরা, শালবনি এবং মেটিয়াবুরুজ সুপার-স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল ও আমতলা ট্রমাকেয়ার ইউনিটের বিষয়টিও নজরে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যভবন জানিয়েছে, CCU বা ICU চালু করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বেড এবং যন্ত্রপাতি থাকলেই চলবে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীও রাখতে হবে। নির্দেশিকায় যোগ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল অফিসার এবং নার্সিং স্টাফের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি ইউনিটে সাপ্তাহিক রিভিউ মিটিং করার কথাও বলা হয়েছে। রোগী কিংবা তাঁদের পরিবারের অভিযোগ জানানোর জন্য গ্রিভান্স রিড্রেসাল ব্যবস্থা রাখতে হবে। ফলে ক্রিটিক্যাল কেয়ার পরিষেবা চালু হওয়ার পর সেটির মান ও কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় থাকবে। এদিকে রোগী রেফার করার ক্ষেত্রেও কড়া অবস্থান নিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী রেফার করা হচ্ছে বলে নজরে এসেছে। খাতড়া, মাথাভাঙা, দিনহাটা, দুর্গাপুর, হলদিয়া এবং ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালের রেফারেল নিয়ে বিশেষভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ছাতনা ও ওন্দা সুপার-স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল এবং দার্জিলিং, কালিম্পং ও আসানসোল জেলা হাসপাতালের রেফারেল হারও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যভবনের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, কোনও রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর আগে তাঁকে যথাসম্ভব স্থিতিশীল করতে হবে। যে হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে সেখানে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেডের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা আগে নিশ্চিত করা জরুরি। বেড নিশ্চিত না করে রোগী পাঠানো যাবে না। রেফারেলের আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডেপুটি সুপার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারকে বিষয়টি জানাতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যভবনের ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুমের সহায়তা নেওয়া যাবে। তবে রোগীর পরিবার নিজেদের সিদ্ধান্তে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে সেটিকে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করার নির্দেশ রয়েছে।
স্বাস্থ্য দফতর ক্রিটিক্যাল কেয়ার পরিষেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার দিকেও এগোচ্ছে। রোগীর চিকিৎসা, ভাইটাল প্যারামিটার, ওষুধ, নার্সিং পরিষেবাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম’ পোর্টালে নথিভুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, কাগজের রেজিস্টারের বদলে ধীরে ধীরে ডিজিটাল বা ‘পেপারলেস CCU’ ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য দফতরের এই উদ্যোগে সরকারি হাসপাতালগুলির অব্যবহৃত ক্রিটিক্যাল কেয়ার পরিকাঠামোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি গুরুতর রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় রেফারেল কমলে বড় হাসপাতালগুলির উপর চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশিকার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে অভিন্ন ICU গাইডলাইন কার্যকর করার উদ্যোগের সঙ্গেও রাজ্যের এই পদক্ষেপকে যুক্ত করা হচ্ছে।

Leave a comment