চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। হাইকোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকার এই দল গঠন করেছে। নেতৃত্বে রয়েছেন হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। কমিটিতে বিপর্যয় মোকাবিলা ও নাগরিক সুরক্ষা দফতরের সচিব, রাজ্যের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের সচিব এবং ডিজি-আইজি-সহ একাধিক আধিকারিক রয়েছেন। তিন মাসের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। তবে এত অল্প সময়ে তদন্ত শেষ করা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন সিটের প্রধান।

অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর বক্তব্য, প্রথমে দুর্ঘটনার কারণ এবং কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, “এখনও তো বিস্তারিত কিছু আলোচনা হয়নি। প্রথমে আমাদের দেখতে হবে যে কার দোষে এই ঘটনাটি ঘটল। এতগুলো যে মৃত্যু, সেটা কী কী কারণে? সেটা খুঁজে বার করতে হবে। দোষীদের দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। আর যাতে এই ঘটনা না ঘটে, পুজো কমিটিগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হবে।” তিন মাসে রিপোর্ট জমা দেওয়াকে চ্যালেঞ্জিং বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করবে সিট।

দুর্ঘটনার দিন ঠিক কী ঘটেছিল, ভিড় কখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, কীভাবে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হল—তদন্তে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজবে কমিটি। অতিরিক্ত ভিড়ের পাশাপাশি খারাপ আবহাওয়া, গেট নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিংবা কোনও গুজব পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।

সেদিনের আবহাওয়ার রিপোর্ট পরীক্ষা করে দেখা হবে বৃষ্টি বা বজ্রপাতের কোনও প্রভাব ছিল কি না। মণ্ডপে ঢোকা ও বেরনোর রাস্তা, ব্যারিকেড, সিঁড়ি এবং জরুরি নির্গমনের ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখবেন তদন্তকারীরা।

পুজো উদ্যোক্তাদের ভূমিকার পাশাপাশি পুলিশের প্রস্তুতি এবং দমকল, হাসপাতাল, কলকাতা পুরসভা, সিইএসসি ও পূর্ত দফতরের পদক্ষেপও খতিয়ে দেখা হবে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ ও অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কতটা সময় লেগেছিল, সেটিও তদন্তের অংশ।

তদন্তের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলে তোলা ভিডিয়ো, কল রেকর্ড এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হবে। ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা, বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ম মেনে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা-ও দেখা হবে। কারও গাফিলতি বা কর্তব্যে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারে সিট। মৃতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

ভবিষ্যতে বড় পুজোয় যাতে এমন বিপর্যয় না ঘটে, সে জন্যও পরামর্শ দেবে কমিটি। উত্তর কলকাতার সরু গলিতে ভিড় সামলাতে প্রবেশ ও বেরনোর আলাদা পথ, দর্শনার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সিসিটিভি নজরদারি, মাইকে ঘোষণা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে সুপারিশ করা হতে পারে।

চোরবাগান কাণ্ডে আগেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের বক্তব্যকে সমর্থন করে তিনি বলেছিলেন, ঘটনার সময় কারা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁর কথায়, “সেই মানুষটা দর্শনার্থী কিনা, চক্রান্তকারী কিনা, টেম্পোরারি হোম গার্ড কিনা, ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবক কিনা, বা অন্য কেউ, সেটা দেখা হবে।”

মণ্ডপ ভেঙে পড়ার কথা মাইকে ঘোষণা করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাত দুটো নাগাদ তিনি নিজে মণ্ডপ ঘুরে দেখেছিলেন। সেই সময় মণ্ডপ ভেঙে পড়েনি বলেও জানান তিনি। দড়ি ধরে থাকা ব্যক্তিদের সেই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন শুভেন্দু।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তা সিটের তদন্তেই স্পষ্ট হবে। তবে একাধিক দিক খতিয়ে দেখে তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়াই এখন কমিটির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a comment