দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে নতুন মণ্ডপের খোঁজ করেন অনেকেই। হাওড়া ও হুগলির পুজোগুলিতেও এ বার রয়েছে নানা আয়োজন। কোথাও বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা, কোথাও বাংলার লোকসংস্কৃতি। আবার কোনও মণ্ডপে উঠে আসছে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, কোথাও দেখা মিলবে জমিদারবাড়ি কিংবা রাজবাড়ির আদল। হাওড়ার ভারতমাতা সঙ্ঘের পুজোয় জড়িয়ে রয়েছে স্বাধীনতার ইতিহাসও। পুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরোলে এই সাতটি মণ্ডপ ঘুরে দেখতে পারেন।
হিজলক পূর্বপাড়া: বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা
বাগনানের হিজলক পূর্বপাড়ার দুর্গাপুজো এ বার ১৬ বছরে পড়ল। স্থানীয় আটচালায় হবে পুজো। প্রতিমা তৈরি করছেন অতনু চন্দ্র। থিমের ভাবনা গৌরব চক্রবর্তীর। এ বারের পুজোর মূল বিষয় বাল্যবিবাহ রোধ।
মহাষষ্ঠীর দিন পুজোর উদ্বোধন উপলক্ষে গ্রামের প্রায় ৭০০ জননীকে আলতা ও সিঁদুর দিয়ে সংবর্ধনা জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের সহযোগিতায় হবে সচেতনতা শিবির। বাল্যবিবাহের কুফল এবং মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়ার গুরুত্ব নিয়ে নাটক পরিবেশন করবেন গ্রামের মহিলারা।
উদ্যোক্তা সুরজিৎ দাস জানিয়েছেন, পুজোর মাধ্যমে এলাকায় বাল্যবিবাহ বন্ধের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান তাঁরা। সেই লক্ষ্যেই নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
বরুন্দা বিবেকানন্দ পল্লি কল্যাণ সমিতি: থিম ‘বহন’
বাগনানের বরুন্দা বিবেকানন্দ পল্লি কল্যাণ সমিতির পুজো এ বার ৩০তম বর্ষে। থিম ‘বহন’। জীবনের নানা ক্ষেত্রে এই শব্দের অর্থ কীভাবে বদলে যায়, তা মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পী কৃষাণু রায়।
মায়ের গর্ভে সন্তানের বেড়ে ওঠা থেকে সংসারের দায়িত্ব সামলানো, আবার জীবিকার তাগিদে মানুষের পরিশ্রম—সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বহনের ভাবনা। নৌকো যাত্রী বহন করে, রিকশাচালক মানুষকে পৌঁছে দেন গন্তব্যে। সময়ও বয়ে নিয়ে চলে জীবনের পরিবর্তন।
এই ভাবনা থেকেই মণ্ডপে থাকছে নৌকো, হাতেটানা রিকশা এবং এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলার মডেল। ছবি ও নানা উপকরণ দিয়ে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ।
চুঁচুড়া মার্কণ্ডগলি: গেরুয়া মাটির পথে বাউল দর্শন
চুঁচুড়া মার্কণ্ডগলি সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির পুজো এ বার ৪৯তম বর্ষে। ‘গেরুয়া মাটির পথে’ থিমে বাংলার লোকসংস্কৃতি ও বাউল দর্শনকে তুলে ধরছেন উদ্যোক্তারা। গেরুয়া রঙের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ত্যাগ, সাধনা ও মানবতার ভাবনাই এ বারের পুজোর মূল আকর্ষণ।
বাঁশ, খড়, পোড়ামাটি, একতারা, দোতারা ও খমক দিয়ে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। বাউল দর্শনে মানুষের অন্তরে ঈশ্বরের সন্ধানের কথাই বলা হয়। সেই ভাবনা থেকে মণ্ডপে উঠে আসবে ‘মনের মানুষ’-এর প্রসঙ্গ।
উদ্যোক্তা সৌরভ দাস জানিয়েছেন, মণ্ডপে আবহসঙ্গীতের ব্যবস্থা থাকছে। একতারা, দোতারা, খমক ও বাঁশির সুরের পাশাপাশি শোনা যাবে লালন, পাগলা কানাই ও দুদ্দু শাহের ভাবগান।
চণ্ডীতলা নবজাগরণ সঙ্ঘ: জমিদারবাড়ির সাজে মণ্ডপ
এক সময় বাংলার বহু জমিদারবাড়িতে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হত। সেই পুরনো দিনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই চণ্ডীতলার নবজাগরণ সঙ্ঘের এ বারের থিম জমিদারবাড়ি। পুজোটি ২৭তম বছরে পড়ল।
পৃষ্ঠপোষক সুবীর মুখোপাধ্যায়ের কথায়, দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। সেই আবেগ থেকেই বনেদি বাড়ির পরিবেশ তুলে ধরার উদ্যোগ। মণ্ডপের পাশাপাশি প্রতিমাতেও থাকছে সাবেকি ছোঁয়া। একচালার প্রতিমায় মায়ের টানা চোখ ও হলুদ বর্ণের মুখ নজর কাড়বে। মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী।
কোন্নগর বৈশাখী ক্লাব: সোনার কেল্লায় ফেলুদা
ফেলুদার গল্প আর সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার অনুরাগীদের জন্য এ বার আকর্ষণীয় হতে পারে কোন্নগরের বৈশাখী ক্লাবের পুজো। ২৬তম বর্ষে মণ্ডপের থিম ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।
১৯৬৫ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ কাহিনির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ফেলুদা। পরে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় এই গোয়েন্দা চরিত্র আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই দুই ছবির পরিচিত দৃশ্য ও চরিত্র মণ্ডপে তুলে ধরা হচ্ছে।
চলচ্চিত্রম সিনেমা হলের কাছে রাস্তার পাশে লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি হয়েছে সোনার কেল্লা। পাশে থাকছে কয়লায় চালিত রেল ইঞ্জিনের প্রতিরূপ। ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ুর মডেলের পাশাপাশি দেখা যাবে সিনেমার পরিচিত সংলাপও।
সভাপতি অমিতকুমার মিত্র জানিয়েছেন, ক্লাবের সদস্যরাই মণ্ডপ তৈরির কাজ করেছেন। সম্পাদক নীলোৎপল ঘোষের কথায়, মূল ভাবনাটি তাঁর। পুজো হবে একচালার প্রতিমায়।
হাওড়া ভারতমাতা সঙ্ঘ: পুজোয় স্বাধীনতার স্মৃতি
হাওড়ার নটবর পাল রোডের ভারতমাতা সঙ্ঘের পুজো শুরু হয়েছিল ১৯২৪ সালে। ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার ভাবনা নিয়ে দেবী দুর্গাকে ভারতমাতা রূপে পুজো করা শুরু হয়। এ বার সেই পুজো ১০৩তম বর্ষে পড়ল।
গত মঙ্গলবার তৃতীয়ার সন্ধ্যায় পুজোর উদ্বোধন করেন রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ জগন্নাথ সরকার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবী রমাপ্রসাদ ভট্টাচার্য, পুজো কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রূপায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এবং প্রধান উদ্যোক্তা সৌম্য ঘোষ। এ দিন শতাধিক মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।
বৈদ্যবাটি জোড়া অশ্বত্থতলা: রাজবাড়ির আদলে পুজো
বৈদ্যবাটির জোড়া অশ্বত্থতলা সার্বজনীন দুর্গোৎসব সম্মিলনীর পুজো এ বার ৫৮ বছরে পড়ল। থিম ‘রাজবাড়ি’। পুরনো দালান ও অতীতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার ভাবনায় সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ।
বুধবার চতুর্থীর দিন পুজোর উদ্বোধন করেন আদ্যাপীঠ রামকৃষ্ণ সংঘের ব্রহ্মচারী উৎসব ভাই মহারাজ। পুজোর পাশাপাশি সামাজিক কাজেও উদ্যোগী হয়েছেন উদ্যোক্তারা। দুর্গোৎসব সম্মিলনী ও জোড়া অশ্বত্থতলা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে বিনামূল্যে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।
বাল্যবিবাহ রোধ থেকে বাংলার লোকসংস্কৃতি, ফেলুদার গল্প থেকে স্বাধীনতার ইতিহাস—হাওড়া ও হুগলির এই পুজোগুলিতে থাকছে নানা বিষয়ের সমাহার। ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা করলে তালিকায় রাখতে পারেন এই মণ্ডপগুলিও।

Leave a comment