হাতেগোনা আর কটা দিন। এরপরই আপামর বাঙালি মাতবে শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোতে। আর এই পুজোকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে বদলাবে শহর থেকে গ্রামের সর্বত্র চেনা ছবি। কিন্তু জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির আমগুড়িতে দুর্গাপুজোর আবহে মিশে যায় কয়েক শতকের পুরনো লোকসংস্কৃতি। এখানে দেবী দুর্গা আসেন রাজবংশী বধূর সাজে। রক্তিম বর্ণের প্রতিমার মুখে থাকে মৃদু হাসি। সাজেও নেই বাড়তি আড়ম্বর। যেন একেবারে ঘরের মেয়ে।
আমগুড়ি বাজার সংলগ্ন বসুনীয়া বাড়িতে ১৮১০ সাল থেকে চলে আসছে এই পুজো। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ধনবর বসুনীয়া এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই হিসেবে এ বার ২১৬ বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই চলছে প্রস্তুতি। ডুয়ার্সের অন্যতম প্রাচীন পুজো হিসেবেও এই আরাধনার কথা উঠে আসে।
রাজবংশী সমাজে দুর্গা পরিচিত ‘দেবী ঠাকুরানি’ নামে। বসুনীয়া বাড়িতেও সেই নামেই তাঁর পুজো হয়। প্রতিমার সাজে রয়েছে সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতির ছাপ। পরনে থাকে ‘ফোতা’ অথবা ‘পাটানি’। অলংকারও খুব সাধারণ। তবে নজর কাড়ে দেবীর মুখ। লালচে বর্ণের মুখাবয়বে ফুটে ওঠে রাজবংশী ঘরের বধূর সরলতা। ঠোঁটের কোণে যেন লাজুক হাসি।
দেবীর মাথায় থাকে ‘শেয়ারা’। রাজবংশী সমাজে একসময় বিয়ের সময় কনের মাথায় যে মুকুট পরানো হত, সেটিই শেয়ারা নামে পরিচিত। সেই প্রাচীন বিবাহরীতির স্মৃতিই এখনও জায়গা করে নেয় দেবীর সাজে।
শুধু প্রতিমা নয়, পুজোর রীতিতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। দেবীর আরাধনার আগে পুজো করা হয় ‘গ্রাম ঠাকুর’-এর। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী, গ্রাম ঠাকুর হলেন শিব। নবমীর দিন হয় যাত্রাপুজো। কৃষিজীবী রাজবংশী সমাজের কথা মাথায় রেখে পুজোমণ্ডপে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সামগ্রীরও পুজো করা হয়। মণ্ডপকেও বলা হয় ‘থান’। সেখানে শহরের বড় পুজোর মতো আলোর ঝলকানি বা জাঁকজমক নেই। বরং গ্রামের চাষির বাড়ির মতোই সাদামাটা পরিবেশ।
১৮১০ সালে আমগুড়িতে পুজো শুরু হলেও তখন এলাকায় মৃৎশিল্পী, পুরোহিত কিংবা ঢাকির পরিবার পাওয়া যেত না। ফলে প্রথম দিকে অধুনা বাংলাদেশের রংপুর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রতিমা নিয়ে আসা হত। পরে ধনবর বসুনিয়ার ছেলে মুসব্বর বসুনীয়া রংপুর থেকে একটি মৃৎশিল্পী পরিবারকে এলাকায় নিয়ে আসেন। তাঁদের থাকার জন্য নিজের জমি দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে অসম থেকে পুরোহিত ও ঢাকির পরিবারকেও নিয়ে এসে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।
বসুনীয়া পরিবারের সঙ্গে কোচবিহার রাজপরিবারেরও যোগ ছিল। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, ধনবর বসুনীয়া কোচবিহার রাজপরিবারের পুজো দেখেছিলেন। সেই পুজোর প্রতিমার রক্তিম বর্ণ তাঁর মনে দাগ কেটেছিল। নিজের পুজোয়ও তাই দেবীর বর্ণে সেই বৈশিষ্ট্য বজায় রাখেন তিনি। পাশাপাশি নিজের সমাজের বধূদের আদলে প্রতিমার মুখের গড়নও ঠিক করেছিলেন।
লোকসংস্কৃতি গবেষক তথা রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য দীপক রায়ের মতে, সামাজিক কৌলীন্য ও নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখার ভাবনা থেকেই ধনবর বসুনীয়া পুজো শুরু করে থাকতে পারেন। পরিবারের নথি অনুযায়ী, একসময় রংপুর ও কোচবিহার-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ এই পুজো দেখতে আমগুড়িতে আসতেন।
সময় বদলেছে। হারিয়েছে জোতদারি আমলের প্রতাপ। বদলেছে পরিবারের আর্থিক অবস্থাও। কিন্তু পুজোর রীতিতে সেই পুরনো দিনের ছাপ এখনও স্পষ্ট। প্রতিমা তৈরি থেকে মণ্ডপের ধরন—সবেতেই যেন ইতিহাসের ছোঁয়া।
এই কারণেই ষষ্ঠী থেকেই বসুনীয়া বাড়ির পুজোয় ভিড় জমে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, লোকসংস্কৃতিপ্রেমী এবং পর্যটকদেরও দেখা যায় সেখানে। এ বার মহাসপ্তমীতে আয়োজন করা হবে রাজবংশী সাহিত্য বাসরের। ফলে দেবী আরাধনার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চারও সাক্ষী থাকবে আমগুড়ি।

Leave a comment