আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও রাসায়নিকের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশের শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে ভারত। সেই লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস। এই শিল্পকেন্দ্রে নতুন করে ৬০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে ‘অ্যাডপার্মা’। এই বিনিয়োগের ফলে ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তাতে ওষুধ, গাড়ি এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের মতো একাধিক ক্ষেত্রে রাসায়নিকের জোগান আরও মজবুত হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে রাসায়নিক আমদানির উপর নির্ভরতাও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথে তেল পরিবহণ ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। জ্বালানির পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রেও স্বনির্ভরতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

এই পরিস্থিতিতে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের সম্প্রসারণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ৬০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে নতুন উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ফেনল ও অ্যাসিটোন তৈরির ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হবে। নতুন কারখানায় মূলত অ্যাসিটোন উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হবে। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে ৩৪৫ কেটিপিএ বা ৩.৪৫ লক্ষ টন ফেনল এবং ২১৫ কেটিপিএ বা ২.১৫ লক্ষ টন অ্যাসিটোন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছ।

ফেনল ও অ্যাসিটোন বিভিন্ন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ওষুধ তৈরি, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স এবং রং উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে এই দুই রাসায়নিকের ব্যবহার রয়েছে। ফলে হলদিয়ায় উৎপাদন বাড়লে দেশের বিভিন্ন শিল্প সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।

বাজারে সরবরাহের সমস্যা কিংবা দামের ওঠানামার প্রভাব একাধিক শিল্পে পড়ে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে সেই চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো গেলে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও কমতে পারে। তবে তার জন্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা। এখানে উৎপাদনের পাশাপাশি প্যাকেজিং ও বণ্টনের মতো কাজের পরিকাঠামো রয়েছে। একই জায়গায় একাধিক ধাপের কাজ হওয়ায় পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়েই আরও বড় পরিসরে রাসায়নিক উৎপাদন ও বণ্টনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হলদিয়াকে ঘিরে আরও শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। রাসায়নিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থা ছাড়াও পরিবহণ, প্যাকেজিং এবং অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রেও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাতে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রও উপকৃত হতে পারে।

দেশের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের উৎপাদন বাড়ানোই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। আমদানির উপর নির্ভরতা কমাতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ সচল রাখা সহজ হবে। সেই দিক থেকে হলদিয়ার এই বিনিয়োগ কেন্দ্রের আত্মনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজ কত দ্রুত শেষ হয়, কবে থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হয় এবং বাজারে তার প্রভাব কতটা পড়ে, সেদিকেই নজর থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়লে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস শুধু রাজ্যের নয়, দেশের রাসায়নিক শিল্পের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

Leave a comment