পুজোর ছুটিতে ডুয়ার্সের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় বাড়ছে। অথচ বক্সা টাইগার রিজার্ভে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। পর্যটকদের জন্য জঙ্গল খুলে দেওয়া হলেও সাফারি করতে আসছেন না কেউ। ফাঁকা পড়ে রয়েছে হোমস্টেগুলি। আগে থেকে বুকিং করা পর্যটকদের একাংশও তা বাতিল করেছেন বলে দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। তাঁদের অভিযোগ, একের পর এক সাফারি রুট বন্ধ থাকায় বক্সায় বেড়াতে আসার আগ্রহ হারাচ্ছেন পর্যটকেরা। তার সঙ্গে বনবস্তির বাসিন্দাদের আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিহার থেকে তিন বছর বয়সি একটি বাঘিনিকে এনে বক্সার জঙ্গলে ছাড়া হয়েছে সম্প্রতি। সেই কারণে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বক্সা টাইগার রিজার্ভে পর্যটন পরিষেবা বন্ধ ছিল। ১০ অক্টোবর থেকে ফের জঙ্গল খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রথম দিনেই বাধার মুখে পড়ে পর্যটন পরিষেবা। জঙ্গলের ভিতরে থাকা ১৮টি বনবস্তির বাসিন্দারা প্রবেশের বি এফ রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। ফলে সেদিন কোনও পর্যটকই জঙ্গলে ঢুকতে পারেননি। সন্ধ্যায় অবরোধ উঠে গেলেও পর্যটকদের দেখা মেলেনি।

তার পর থেকে হোমস্টেগুলিতে কার্যত সুনসান পরিবেশ। আলিপুরদুয়ার ডিস্ট্রিক্ট ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মানব বক্সির দাবি, পুজোর আগে বন দপ্তরের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে পর্যটন ব্যবসায়। তিনি বলেন, বনবস্তির বাসিন্দাদের আন্দোলনের দাবির প্রতি তাঁরা সহমর্মী। কিন্তু পর্যটক না আসায় হোমস্টে মালিকদের ব্যবসা মার খাচ্ছে। আগে থেকে যাঁরা ঘর বুক করেছিলেন, তাঁদের অনেকে বুকিং বাতিল করে টাকা ফেরত নিয়েছেন।

বন দফতরের বক্তব্য অবশ্য আলাদা। বক্সা টাইগার রিজার্ভের পূর্ব বিভাগের উপক্ষেত্র অধিকর্তা দেবাশিস শর্মা জানিয়েছেন, ১০ অক্টোবর থেকেই পর্যটকদের জন্য জঙ্গল খুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন পরিবেশে বাঘিনিকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিতে হবে। তাকে যাতে বিরক্ত করা না হয়, সেই কারণে কয়েকটি রুটে সাফারি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে অন্য কয়েকটি রুটে সাফারি চালু রয়েছে। পর্যটকেরা কেন আসছেন না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাননি তিনি।

সাফারি চালকদের অভিযোগ, জনপ্রিয় রুটগুলি বন্ধ থাকায় পর্যটকদের আগ্রহ কমেছে। তাঁদের দাবি, চুনিয়া ওয়াচ টাওয়ারের মতো জায়গায় সাফারি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মহাকাল রুট খোলা রয়েছে বলে জানানো হলেও সেখানে যাওয়ার রাস্তা তৈরি হয়নি। ফলে পর্যটকেরা বক্সায় এসে কোথায় ঘুরবেন, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হচ্ছে। তাঁদের আরও দাবি, রুটের সমস্যার কারণে পর্যটকদের ঘোরার খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

সাফারি গাড়ির চালক কিষান দাস বলেন, পর্যটক না থাকায় গাড়ি চালিয়ে আয় হচ্ছে না। তার উপর পছন্দের রুটগুলিতে সাফারি বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে গাড়ি চালিয়ে লাভ কী? সেই কারণেই বনবস্তির বাসিন্দাদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তাঁরা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সাফারি গাড়ি চালু করবেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বনবস্তির বাসিন্দাদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল গত ৫ অক্টোবর। রাজাভাতখাওয়া গেটের কাছে জঙ্গলের ভিতরে থাকা ১৮টি বনবস্তির বাসিন্দারা অবস্থান বিক্ষোভে বসেন। বন দপ্তরের কড়া নিয়মের প্রতিবাদ জানানো এবং বনাধিকার আইন, ২০০৬ কার্যকর করার দাবিতেই তাঁদের এই আন্দোলন। ১০ অক্টোবর রাস্তা অবরোধ তুলে নেওয়া হলেও অবস্থান বিক্ষোভ এখনও চলছে। আন্দোলনে সামিল হয়েছেন সাফারি গাড়ির চালকদের একাংশও।

জঙ্গল খুললেও তাই বক্সায় এখনও স্বাভাবিক হয়নি পর্যটন পরিষেবা। বাঘিনিকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু রুট বন্ধ রেখেছে বন দপ্তর। অন্যদিকে, বনবস্তির বাসিন্দাদের আন্দোলন এবং সাফারি চালকদের অসন্তোষও মেটেনি। সব মিলিয়ে পুজোর মরশুমে পর্যটক না আসায় সমস্যায় পড়েছেন হোমস্টে মালিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, এখন সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তাঁরা।

Leave a comment